কোন্ দেবতারে ভোট মোরা করি সমর্পণ?

কোন্ দেবতারে ভোট মোরা করি সমর্পণ?

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ⤡

আখর বন্দ্যোপাধ্যায়⤡

Posted on 21st April, 2026 (GMT 05:02 hrs)

“To Which God Shall We Offer Our Vote?” (Kon Devotare Vote Mora Kari Samarpan?) is a bold, agit-prop Bengali political satire that fuses Vedic philosophy, Sufi syncretism, and sharp contemporary critique.

Set against the backdrop of electoral frenzy and rising majoritarianism, the play opens with the ancient Rigvedic question — “To which god shall we offer our oblation?” — and relentlessly interrogates modern democracy: To which “god” (leader, ideology, or system) do we surrender our vote?

Through a chaotic, interactive performance blending Vedic chants, Odissi dance, folk songs, revolutionary anthems, and raw audience confrontation, the central figure “I” grapples with spectators who defend “Sanatan” traditions while the bold dancer (Nati) asserts women’s agency and challenges patriarchal and caste hierarchies. The narrative explodes into a ritualistic feast involving beef and rum — reclaiming Vedic practices — even as it skewers Hindutva nationalism, voter list manipulations, algorithmic governance, and the deification of political leaders.

Drawing from the Nasadiya Sukta’s cosmic doubt, the Hiranyagarbha hymn, Tagore’s universalism, and Bulleshah’s call to break temples and mosques but never the heart filled with love, the play dismantles blind faith, communal polarization, and electoral farce. It urges the audience to choose critical inquiry (pariprashna) over blind surrender and syncretic humanity over division.

Provocative, multilingual, and deeply theatrical, this piece is both a Vedic question and a urgent political provocation — asking whether democracy itself has become just another god demanding blind oblation.

A powerful meditation on faith, power, and the right to doubt in an age of manufactured certainty.

চরিত্রলিপি

আমি—একজন utterly confused ভাঁড়

দর্শক ১— সেকু-মাকু লিবারান্ডু 

দর্শক ২— নাগপুর থেকে আ(ম)দানি হওয়া এক বং চাড্ডি

দর্শক ৩— আরেক সেকু-মাকু লিবারান্ডু

নটী— বারাঙ্গনা বীরাঙ্গনা জনপদকল্যাণী

যুবক–Gen Z /Zoomers


সবাই— মাচার বাইরে-ভেতরে, ওপরে-নিচে, আশেপাশে যতো মানুষজন; দর্শক, না-দর্শক প্রমুখ

[মাঁচা আঁধার। পর্দার ওপর দু’দিক থেকে দুটো আলো এসে পড়ে। শুরু হয় গানঃ

“বেশক মন্দির মসজিদ তোড়ো বুল্লেশাহ বলে

বেশক মন্দির মসজিদ তোড়ো

পর প্যার ভরা দিল কভি না তোড়ো

ইস দিল মে দিলবর রহতা

জিস পলড়ে মে তুলে মোহব্বত

উস মে চাঁদি নেহি তোলনা

তৌবা মেরি না ঢোলনা

ম্যায় না বলনা

ও নেহি বলনা জা

ও ম্যায় নেহি বলনা জা

আগ সে ইশক বরাবর দোনো পর পানি আগ বুঝায়ে

আগ সে ইশক বরাবর দোনো পর পানি আগ বুঝায়ে…”

গান শেষে ধীরে ধীরে পর্দা খুলে যায়। মাঁচায় একা “আমি” দাঁড়িয়ে আছে।]

আমি।। পেত্থমেই গড় করি বড়ো মান-হুঁশ গুরুমহাই, রাজাগজা মনতিরি-সান্তিরি, জজ-ম্যাজিস্টর-ব্যারিস্টর, ED-CBI-IT-দপ্তরের বড়ো বড়ো সদাগর আর ঋণখেলাপি ভেগে পড়া অতিধনী বেওসাদারদের। তারপর সনাতন হিঁদুবাদী নান্দী দিয়ে শুরু করি আমার বেজায় মুশকিলের বেত্তান্ত।  

[দর্শক আসনের মধ্যে থেকেই তিনজন একে-একে উঠে যায় মাচায়। ঘিরে ধরে “আমি”-কে।]

দর্শক ১ (চেঁচিয়ে)।। “সনাতন” ব্যাপারটা কী বলুন তো মশাই। 

আমি।। আরে দূর মহাই। দিলেন তো পেত্থমেই বাগড়া। আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ বটেক। আমি সনাতনের ইঞ্জিরি করি “most oldest”। এবার যা বোঝার বুজে নিন চোখ বুজে।

দর্শক ১।। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ? এদিকে তো এই চমৎকার ভুল ইংরেজি জায়েন ঝাড়লেন Shakespeare থেকেঃ “Most unkindness cut of all”– Julius Caesar নাটক থেকে মেরে দিলেন!

আমি।। শেক্ষপীর সাহেবকে গড় করি। উনি না’ থাকলে আমি এই মাঁচায় দাঁড়াতেই পারতুম না। তবে কিনা লাটককার যাহা যাহা লিখেন, তাহা তাহা আমি আওড়াই। আমাদের পোধানমোন্তিরির যেমন টেলিপ্রম্পটার লাগে! আমরা মুখস্ত করি, ওনার তো এতো সাজগোজ করবার পর মুখস্থ করবার আর সময় থাকেনা। অথচ সনাতনীর জানা উচিৎ, “আবৃত্তি সর্বশাস্ত্রানম বোধাদপি গরিয়সী”!

আজ্ঞে হ্যাঁ, এই লাটকের পরিচালক মহাই এই ব্যাপারটার মানে বুইয়ে দিয়েছিলেনঃ  “Most unkindest cut…” –এর মানে আর ব্যা ব্যা ব্যাকোরোন– সবটাই। তিনি কয়েছিলেন, এখন নাকি satire তথা পোহসন নাকি খুবঅই জরুরি, কেননা এই বাংলার আর্থ-রাজনৈতিক এরিনার হাল হকিকত অতীব bad, badder, baddest। তিনি মাইকেল মসু…সু…সুদন, ধ্যাত্তেরি, ম-ধু-সূ-দ-ন দত্তের একটা কোবতের কয়েক লাইন কয়েছিলেনঃ

“অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে,

নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়…।”

যাকগে, আমার ইয়ে পেয়েছে। আপাতত গেলুম। (প্রস্থান)

দর্শক ২।। ওই লোকটা কার নাম করলে? সেই ছোকরা মাতাল কেরেশ্চান মধুসূদন দত্ত?? ধুসস! বঙ্গের আগে রাঢ় বসিয়ে দিলে গো! ছ্যা ছ্যা– ধিধিক্কার। ও ব্যাটা তো রামের আদ্দছেরাদ্দ করে ছেড়েছে!

দর্শক ৩।। বেশ করেছেন। হাঁদাগঙ্গারাম, রামছাগল, বোকাগঙ্গারামদের উনি আর কিই বা বলবেন?? তাই তো বলেছিলেনঃ I despise Ram and his rabbles! বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ গজিয়েছিলো বলেই কিনা বুড়ো ভাম হিঁদু বকধার্মিক ভক্তপ্রসাদ শিবমন্দিরে মোছলমানের মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে লদকালদকি করতে গিয়ে …ছ্যাছ্যা কি আর বলবো মশাই…এই নাটিকা লিখেছিলেন ওই সেই মহাকবি মাইকেল মধুসূদন।

দর্শক ২।। (কপালে হাত ঠেকিয়ে) শ্রীমধুসূদন, শ্রীমধুসূদন। সংস্কারী হিন্দু ককখোনই এমন বাজে কাজ করতে পারে না। ওরে ব্যাটা! আপনারা তো দেখছি লিবারান্ডু, আর্বান নকশাল, টুকড়ে টুকড়ে গ্যাঙ, দেশদ্রোহী অ্যান্টি-ন্যাশানাল, সেকু-মাকু আঁতেল!

দর্শক ৩।। হাঃ হাঃ, আমার কাছে এগুলো কোনো গালিই নয়, বরং গলার হার। হার মানা হার পরালে আমার গলে… ধর্ষক “সংস্কারী” হিঁদুদেরই তো আপনারা গলায় মালা পরিয়ে লাড্ডু খাওয়ান। 

দর্শক ১।। আপনারা সব খাড়া কিছু দেখলেই শিবঠাকুরের বাঁ%# দেখতে পান কেনো? দেখে নেবেন এবার থেকে ওই খাড়া আদলের নিচে পার্বতীর যোনি আছে কিনা। যোনি ভেদ করে অসম্ভব ৯০ ডিগ্রি কোণে ওই খাড়া বাঁ% উঠছে।

দর্শক ২।। দুর বাঁ#*! শ্রীরাম ছাড়া আর কেই বা আমাদের উদ্ধার করবে! জয় শ্রীরাম।  

দর্শক ১।। (উচ্চস্বরে) ভ্যাঁ ভ্যাঁ ভ্যাঁপ্পোর ভোঁওওওওও!!!

দর্শক ৩।। তাহলে আপনারা এই বাংলায় উড়ে এসে জুড়ে বসে মা ক্ষালির নামে লিফলেট ছেড়েছেন কেন, শ্যামাসঙ্গীত গাইছেন কেন?

দর্শক ১।। এটা কি যস্মিন দেশে যদাচার, কাছা খুলে নদী পার… যেখানে যেমন, সেখানে তেমন?? ধম্মের নস্যি ঝেড়ে সুড়সুড়ি দিয়ে খ্যামতা বাগাতে পারলেই হলো, তাই না?   

দর্শক ৩।। ওহ, তাহলে তো ভালোই হলো। এবার কালী তোকে খাবো, নইলে পাঁঠার মাংস খাবো!

দর্শক ২।। ওটি হবেনি মশাই। আমরা শাকাহারী, অহিংস। এবার থেকে কালীপুজোয় চালকুমড়ো, লাউ এই সব বলি দেওয়া হবে। বাংলার মাছ-মাংসের হ্যাংলামো চিরতরে দেবো ঘুচিয়ে।

দর্শক ১।। হাসালেন বটে। আপনারা নাকি শাকাহারি, অহিংস! আপনারা তো নরবলি দিতে ওস্তাদ– দাঙ্গাফ্যাসাদ বাধিয়ে দিয়ে কতো মানব-মানবীকে মেরেছেন আপনারা, তার খেয়াল আছে? আপনাদের উনিজিকে তো দেশে-বিদেশে গুজরাতের কসাই বলেই ডাকা হয়।

দর্শক ৩।। কামাখ্যা আর কালীঘাটের পেসাদ খাইয়ে দেবো যখন, তখন বুঝবেন ঠ্যালা। 

[শুরু হলো চাড্ডি আর সেকু-মাকুদের চরম লড়াই আর হইচই। এমন সময় নটীর প্রবেশ।]

নটীঃ ওরে আবাগীর ব্যাটারা। তোরা কেবল লড়াই করেই মর। ফালতু কাজিয়া ছেড়ে আমাদের নাটক করতে দে না বাপু!  

দর্শক ২।। তুমি কে মা? আহা, কী রূপ। (জিভ চাটতে থাকে)  

নটী।। আমি বীরাঙ্গনাও বটে, বারাঙ্গনয়াও বটে! বিশ্বব্যাপী বাজারের bar-এ bar-এ আমার মতো পণ্যের বারবার চলাফেরা–আমরা না থাকলে ধর্ষণের ঢল নামতো। নহি সামান্যা নারী। আমি কাজ করে খাই, সরকার বাহাদুরের দেওয়া ভাতার ওপর বাঁচিনা। ইয়ে মানে, আমি ভাতারখাগী নই!

আচ্ছা বলুন তো দেখি, মেয়ে দেখলেই আপনাদের মতো মাগীবাজদের কেন মুখ দিয়ে ঝোল পড়ে? ওহ, আপনি বোধহয় আপনাদের বিশ্বগরুর মতো এপ্সটাইনের দ্বীপে যেতে পারেন নি? মা বলে ডাকছেন, এবার ধ-র্ষ্-ন কামনা জাগবে তো? তারপর খুন। অন্তঃসত্ত্বাকে ধ-র্ষ-ণ করে পেট চিরে ভ্রূণ বের করে খুন করে আপনারা নাকি রাজধম্মো পালন করেন। লজ্জা করে না কথা কইতে?

দর্শক ১ আর ৩।। এসব ভাট না বকে শুরু হোক নাটক। ওসব কাজিয়া থাক।

নটী।। বহস না থাকলে গণতন্ত্র থাকে কি?

সবাই।। হোক, হোক বহসও হোক, আবার নাটকও হোক। তবে হে চাড্ডির দল, এভাবে নাটকে বাগড়া দেবেন না…।

[মাঁচা আঁধার হয়]

[৩০ সেকন্ডের মধ্যে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে আলো। ফোকাসে নটী। ওড়িশী নৃত্যভঙ্গীমায় শুরু হয় দেবদাসীর নাচ]  

নান্দীমুখ

নৃত্যরতা নটী গাইছেঃ

হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ ।

স দাধার পৃথিবীং দ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥

য আত্মদা বলদা যস্য বিশ্ব উপাসতে প্রশিষং যস্য দেবাঃ ।

যস্য ছায়ামৃতং যস্য মৃত্যুঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥

যঃ প্রাণতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব ।

য ঈশে অস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম ॥

[গানের সুর সামবেদীয় ছয় স্বরে। ঋগ্বেদীয় তিন স্বর গা-রে-সা নয়। ধ্রুবপদ সমবেত স্বরে গাওয়া হবে]

দর্শক ২।। আরে বাব্বা এ কোন ভাষায় গান হচ্ছে?

দর্শক ১।। সনাতনী বিচিপি সনাতনী বৈদিক ভাষা আর সমোস্ক্রিতো জানে না।

দর্শক ২।। এ বাবা, রামো রামো। মেয়েটা বেদগান গাইছে? ছিঃ ছিঃ। নারী আর শূদ্রের বেদগানে অধিকার নেই। তারওপর আবার এসেছে কোথাকার কোন বেশ্যামাগী!

নটী।। হাঃ হাঃ! বিশ্ববাজারের কালে কেই বা বেশ্যা, কেই বা জিগোলো! তাছাড়া “বেশ্যা” মানে যে বিশেষ সেবিকা, সে ধারণা হয়তো আপনার নেই। মৃচ্ছকটিকম পড়েননি বোধহয়। আরো বলি… আপনি কি জানেন ব্রহ্মজ্ঞা গার্গী, মৈত্রেয়ীদের কথা? জানেন কি মেয়েদেরও হতো মোঞ্জিবন্ধন বা উপনয়ন? “মৌঞ্জি” মানে মুঞ্জ ঘাস। তাই দিয়ে তৈরি হতো কোমরবাঁধা মেখলা। আপনাদের মনুস্মৃতিতে আমাদের আর শূদ্রদের সম্পর্কে হাজার খারাপ কথা থাকলেও, কোনো এক মনু লিখে ফেলেছিলেনঃ “যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ । যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ॥” (মনুস্মৃতি অধ্যায় ৩, শ্লোক ৫৬) যেখানে নারীরা পূজিত হয়, সেখানে দেবতারা রমন করেন। আর যেখানে নারীরা পূজিত হয় না, সেখানে সমস্ত কর্মই নিষ্ফল হয়।

দর্শক১।। রমন কথার মানে জানেন তো সব্বাই? √রম্ ধাতুটার মানে হল গিয়ে “আনন্দ, ক্রীড়া ও প্রেমময় উপভোগ”–কেমন যেন যৌনতার গন্ধ পাচ্ছি। বলা হচ্ছে NP মানে নিরাকার পরম ব্রেহ্ম এই মহাবিশ্বের জম্মো কালের আগে একা রমন করতে পারছিলেন না, তাই তিনি বহু হলেন। বলা হলোঃ “স বা নৈব রেমে, তস্মাদেকাকী ন রমতে; স দ্বিতীয়মৈচ্ছত্ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্, ১.৪.৩)। solitary sex হেব্বি ঝামেলার ব্যাপারস্যাপার।

নটী।। আবার মনুস্মৃতির ৫ম ও ৯ম অধ্যায়ে সম্পূর্ণত ভেন্ন ধাঁচের আজেবাজে বিধান আছে। নারীর কোনো স্বাধীনতা নেই। তবে আমি রবিবাবুর দুটো গান সামান্য এদিক ওদিক করে গাই। এটা এক ধরণের fusion বলতে পারেন। খোদার ওপর খোদকারি আর কীঃ

আমি বীরাঙ্গনা, আমি জনপদকল্যাণী।

নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।

নহি মাতা, নহি কন্যা, নহি বধূ, সুন্দরী রূপসী

পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে সে নহি নহি,

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি।

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটে সম্পদে,

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে,

পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে। আজ শুধু করি নিবেদন–

আমি বীরাঙ্গনা, আমি জনপদকল্যাণী।

আমি স্রেফ কেবল কারো দিদি, কারো বোন, কারো বউ, কারো ঝি, কারো মাসি-পিসি নই… আমি আপাতত এটুকুই বলতে চাই। পুতুলঘর নাটকের নোরার মতোই আমার যাপন, আমার সত্তা!

দর্শক ২।। যত্তোসব বেশ্যা-মাগীকে নিয়ে গান লিখেছে ওই… কি যেন বলে… চোলাই চোলাই টেগোর!

দর্শক ৩।। দিদি, ওর মতো অন্ধগন্ধ ভক্ত আকাটের কথায় পাত্তা না দিয়ে আপনি রবি ঠাকুরের তর্জমাটা বলে দিন।  

নটী।। কিন্তু, গণতন্ত্রে স-তর্ক কাজিয়া তো চাই। আর রবি ঠাকুরের তর্জমাটা এ ব্যাটা বুঝবে কিনা সন্দেহ।

দর্শক ২।। রবি ঠাকুর? সে ব্যাটা আবার কে বে’? রবীন্দ্রনাথ সান্যাল বলে একজনকে চিনি। মোটাভাই তেনার নাম বলেছিলেন। সেই ’ রবীন্দ্রনাথ তো বেটা আস্ত Anti-national! এই বাঙালিগুলো ওকে ঠাকুর ভেবে পুজো করে।

[ঘর জুড়ে তুমুল হাসির রোল ওঠে]

নটী।। No-nation-এর বাসিন্দে এই রবি ঠাকুর। বিশ্বমানবিকতা, গ্রহপরিচয় তথা মানবগোত্রীয় Internationalism বোঝেন কি? বা মহাবিশ্বের মাঝে মানবধর্ম? ওরে মুখপোড়া হনুমান, জেনে রাখ, Nationalism-এর বাপবাপান্ত করেছেন উনি।

দর্শক ১।। যাকগে দিদি। এসব কথাবার্তা চাড্ডির কাছে ট্যান হয়ে যাবে—টিকি এরিয়াল এই Vibe-এই আসবে না। যত্তোসব Culturally illiterate-দের gang! ছাড়ুন তো আপনি। শুনি রবি ঠাকুরের রূপান্তর।

নটী।।

আপনারে দেন যিনি,

সদা যিনি দিতেছেন বল,

বিশ্ব যাঁর পূজা করে,

পূজে যাঁরে দেবতা সকল,

অমৃত যাঁহার ছায়া,

যাঁর ছায়া মহান্ মরণ,

সেই কোন্ দেবতারে

হবি মোরা করি সমর্পণ! (সমবেত)

যিনি মহামহিমায়

জগতের একমাত্র পতি,

দেহবান্ প্রাণবান্

সকলের একমাত্র গতি,

যেথা যত জীব আছে

বহিতেছে যাঁহার শাসন,

সেই কোন্ দেবতারে

হবি মোরা করি সমর্পণ! (সমবেত)

[প্রতিটি ধুয়া সমবেত কণ্ঠে গাইতে হবেঃ “সেই কোন্ দেবতারে হবি মোরা করি সমর্পণ!” গানে বিস্ময়ের (!) বদলে জিজ্ঞাসা (?) ব্যবহার করুন সুরেতালে–।]

দর্শক ৩।। একটু কেমন ভগবান ভগবান ঠেকছে যে!

দর্শক ১।। রাখুন তো মশাই। আপনি কী জানেন না ধম্মো কখনো কখনো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সামান্য ফুলকি আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে? কেতাবি ভাষায় যারে কয় Counter-hegemony! আর বিষের ওষুধ যে বিষ—বিষস্য বিষো মহৌষধম্। চরক-সুশ্রুতের দলবলের কথা এটা। এই চাড্ডিদের ঘায়েল করতে হলে ওদের অস্তরই ব্যবহার করতে হবে গুরু। এজন্য এলেম চাই।

নটী।। আমি মনে করিনা চমৎকার এই কবিতা-বোঝাই ঋগ্বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্তের এই কটা কথা “বিষ”। আমার কাছে এটা মহৎ কবিতা। তবে কিনা, আপনারাও ঠিক। এমনভাবে গাইতে-শুনতে-পড়তে বেশ লাগে। হ্যাঁ, তবে কিনা মূর্খ, বর্বর চাড্ডিদের কাছে এটা বিষবৎ তো বটেই। কেননা, The Capitalists Will Sell Us the Rope with Which We Will Hang Them। ওদের সনাতন-বিষ আমাদের সনাতন-জ্ঞান আশীবিষ দিয়েই ভাঙতে হবে। কিন্তু,

“মরিবে সে কিসে? বিষে?
যাঁরে ভয় করে দেব, দানব, মানব,
নাগ, কিম্পুরুষ—সে কি মরিবে বিষে?”

এ কথা বলছেন আপনাদের কথায় ওই কেরেশ্চান রামবিরোধী শ্রীমধুসূদন ভায়া ইন্দ্রজিৎ!

দর্শক ৩।। তা’বলে এমন দেবতা-দেবতা ভাব? ইয়ে মানে কেমন যেন লাগছে!

নটী।। আপনি কি পুরাণের “দিবি আরোহণ” তত্ত্বের কথা জানেন? এটা মানুষ থেকে দেবতাভাবে উন্নীত হওয়া—হয়ে ওঠা—being থেকে becoming! এখানে দেবতা মানে ঠিক পুতুলদেবতা নয় কিংবা অতিপ্রাকৃত কোনো ব্যাপারও নয়—বরং বিশেষ গুণসম্পন্ন মানবদেবতার আদর্শ। এ তো কেবল জীববিজ্ঞানের বিবর্তন নয়, উদ্বৃত্ত মানবের উদার অভ্যুদয়।

দর্শক ১।। এখন তো VIP, MLA, MP, সদাগররাই দেবতা। VIP-র বাংলা মানে জানেন তো? “Vটের সময় Iহাদের Pআওয়া যায়”।

নটী।। একদম ঠিক বলেছেন। এরপর ভাবুন অজ্ঞেয়বাদী এবং সংশয়ী জিজ্ঞাসাময় নাসদীয় সূক্তের কথা। কেই বা জানে সৃষ্টি কীভাবে হল, কিংবা সৃষ্টির তথাকথিত “আগে” কিই কিংবা কে-ই বা ছিলো, অথবা ছিলো না? তখন কী ছিলো না ব্যাপারটাই ছিলো না- যব কহিঁ পে কুছ নেহি ভি নেহি থা? দেবতারাও পরে এসেছেন, তাঁরাও ও সম্বন্ধে জানেন না। ভাবতে পারেন এমন সংশয়ের কথা আছে খোদ বেদে?

দর্শক ২।। (ঠাট্টার সুরে) তাই তো বলি, সবই ব্যাদে আছে। এই যে ধরুন আমাদের ৫৬ ইঞ্চি সিনাওলা non-biological বিশ্বগুরুর কথা। তিনি তো কি বলে ওই দিবি আরোহণই করেছেন। তিনি ফকির আদমি থেকে এক্কেরে ভগবান।

দর্শক ৩।। হ্যাঁ হ্যাঁ এমন কথাও তো কয়েছেন কবীর সুমন এক স্বঘোষিতা গুণ্ডানিয়ন্ত্রণকারীনী মহীয়সী নারী প্রসঙ্গেঃ উনি নাকি শ’তিনেক বছর পরে দেবী-রূপে পূজিতা হবেন।

দর্শক ১।। রাজনীতিতে যেকোনোরকমের ভক্তি নিশ্চিত একনায়কতন্ত্রের দিকে টেনে নিয়ে যায়, এ কথা বলেছিলেন স্বয়ং বাবাসাহেব। তাছাড়া মেঘনাদ সাহা বেঁচেবর্তে থাকলে এই অন্ধগন্ধ ভক্তদেরকে রামক্যালান কেলাতেন।   

দর্শক২।। ও শুঁড়ির কথা শোনে কে? শূদ্রের ব্যাদ পড়ার অধিকার নেই।

দর্শক ১।। সাহামশাই অব্রাহ্মণ নন, তিনি “দ্বিজোত্তম, তিনি সত্যকুলজাত”। আর আপনি যে মশাই নরেনদাকে পুজো করেন তিনি তো গুজরাতের মোধ ঘাঁচি (Modh Ghanchi) সম্প্রদায়ের লোক। এটা তেলি (Teli) জাতির একটি উপশাখা (sub-caste), যারা ঐতিহ্যগতভাবে তেল উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। গুজরাত সরকার (তখন কংগ্রেস শাসিত) Modh Ghanchi / Teli-কে OBC (Other Backward Classes) লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করে (২৫ জুলাই ১৯৯৪-এর সার্কুলার)। এমন নিচু জাতের লোককে, (তর্কের খাতিরে কইছি, কেননা আমি জাতপাতধম্মো মানি না) আপনারা পুজো করেন কেমন করে? এখন তো শুনছি উনি নাকি বলেছেন যে তিনি নাকি EBC (Extremely Backward Class)! আহা, এক non-bio-logical নিজের নিচুজাত নিয়ে বড়াই করে বলছে।

নটী।। সাহামশাইকে দিয়েই তো “দিবি আরোহণ”-এর তত্ত্বকথা বুঝে ফেলা যায়। তাই না? আর ওই non-bio-logical pawpaw-র কথা ছাড়ুন। ওই বিলাসী লোকটা যখন যেমন, তখন তেমন কথা কয়। কখনো দেবতাত্মে ভর করে, কখনো বা “অতি পিছড়ে পড়” জাতি হয়ে যায়, কখনো হয়তো “ইমেজ” বাঁচাতে নারী শক্তির গুণগানে মাতে। লোকটা তো মিথ্যে কথার ডিপো। শেক্ষপীয়র সাহেব বেঁচে থাকলে, ওকে নিয়ে “King Liar” নাটক লিখতেন।

দর্শক ২।। আচ্ছা, এই আপনারা, বাঙালিরা রামনা্মের সঙ্গে আজেবাজে শব্দ জোড়েন কেন? খুবই খারাপ লাগে। “রামক্যালানো” কথাটা খুবই অশ্লীল।  

দর্শক ৩।। তাহলে এমন রামপ্যাঁদান প্যাঁদাবো যে রাম উলটেপালটে মরা হয়ে যাবে। আপনারা রামনাম করেন আমাদের মতো সেকু-মাকুদের ভূত-তাড়ানোর তাগিদে। আমরা তো ভূতপূর্ব, আর আপনারা হলেন গিয়ে সনাতন। তবে কিনা অভূতপূর্ব হতে আর বেশি দেরি নেই।  আপনাদের সঙ্গে ঝামেলা এখানেইঃ একাধিক ভূততাড়া করে বেড়াচ্ছে জগতে— কমিউনিজমের ভূত। আপনারা রামনাম করে তাকে তাড়াতে পারবেন না। Spectres de Marx: l’état de la dette, le travail du deuil et la nouvelle Internationale।

দর্শক ২।। ঠিক ধরেছি। তোরা ব্যাটা মাকু-সেকু-কমি। কীসব ভীষণ ভাষায় কথা কইছে রে বাবা। তোরা বুঝিস না যে আমাদের পরমপূজ্য supreme leader হলেন স্বয়ং কল্কি অবতার। হ্যাঁ রে ব্যাটা, বিষ্ণুর অবতার। তোরা তাঁর অপার মহিমা বুঝবি কিকরে? বিদেশে গিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসেন উনি। তোরা সেসব নিয়ে ছোকরা-ছ্যাকরা খি খি হি হি মিম ভিডিও বানাস। ছিঃ! অবতারবাদ বুঝতে হলে তোদের সেই পুরুষত্তম শ্রীরামচন্দ্র কিংবা দেববর ইন্দ্রদেবের পাঠ দিয়ে শুরু করতে হবে। কিস্যু তো জানিস না এসব, খালি ফোরেনের যতো বুড়ো ভামদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করিস। একটু সাত্ত্বিক জীবন চর্চা কর দেখি!

দর্শক ১।। ও বাবা! রামচন্দ্র স্বয়ং শিকার করা মাংস সহযোগে মৈরেয় মদে চুবে থাকতেন। ওর থেকে আবার সাত্ত্বিক চর্যা কিকরে শিখব বল!

নটী।। দেখুন মশাই, তাছাড়া পুরধ্বংসকারী দখলদার পুরন্দর ইন্দর বা ইন্দ্র একক মানুষ নন—এটা পদমর্যাদামাত্র। এক ইন্দ্রকে দেখি সোমরস পান করে গদগদ হয়ে গড়াগড়ি খেতে। ঋক ১০.১১৯, ১.৩২, ৪.২৬ দেখুন। আর ইন্দ্র তো লম্পট।  ইন্দ্রকে বলা হয়েছে — যেমন একজন রাজা তাঁর একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে বাস করেন, তেমনই তুমি তোমার গৌরবে বিরাজিত (৭.১৮.২)। সমুদ্রের ঢেউএর মতো ইন্দ্রকে ঘিরে ধরে সুন্দরী স্ত্রীরা তাদের স্বামীকে ইন্দ্রভাবে আলিঙ্গন করেন (১০.৪৩.১)। আরেকটি মন্ত্রে বলা হয়েছে, যেমনভাবে আকাঙ্ক্ষিত স্ত্রীরা তাদের স্বামীকে স্পর্শ করে, তেমনভাবেই স্তোত্রগুলো ইন্দ্রকে স্পর্শ করে (১.৬২.১১)। এমনকি যজ্ঞের ঘৃতের ধারাকেও তুলনা করা হয়েছে অনুগত স্ত্রীদের সঙ্গে, যারা ভাতারের (৪.৫৮.৮) পিছুপিছু চলে। আবার বরুণ দেবতার অনুপ্রেরণায় বারুণী মদের নামকরণ! বরুণকে বেদে এক জায়গায় “অসুরঃ পিতানঃ” হিসেবেও মান দেওয়া হচ্ছে। খেয়াল রাখবেন, একসময় ইন্ডিক-ইরানীয় ঐতিহ্যে অসুর/আহুর বলতে ইতিবাচকভাবে প্রজ্জ্বল মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝানো হতো।

যাকগে — একটা গপ্পো শুনবেন? ব্রহ্মা একদিন অপূর্ব সুন্দরী এক নারী সৃষ্টি করলেন, যাঁর নাম রাখলেন অহল্যা (যাঁর মধ্যে কোনো কলঙ্ক বা অসুন্দরতা নেই)। তিনি তাঁকে ঋষি গৌতমের আশ্রমে রেখে দিলেন। পরে গৌতমের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা অহল্যাকে গৌতমের স্ত্রী হিসেবে সমর্পণ করলেন। অহল্যা ছিলেন অসাধারণ রূপবতী, কাজেই অতি সহজে দেবরাজ ইন্দ্র অহল্যাতে হ্যাল খেতে লাগলেন।

দর্শক ১।। আচ্ছা, ব্রহ্মা কতো আর সুন্দরী নারী তৈরি করবেন? শতরূপার জম্মো দিয়েই, তার রূপে মুগ্ধ হয়ে বিপুল কামেচ্ছায় বাপ ছুটলেন অপরূপা শতরূপার পেছনে পেছনে। সাধে কী আর জোতিবা ফুলে ব্রহ্মাকে “বেটিচোদ” কয়েছেন!

নটী।। আরে গপ্পোটা শেষ করতে দিন মশাই। একদিন গৌতম ঋষি আশ্রমের বাইরে গেলে ইন্দ্র সুযোগ বুঝে গৌতমের রূপ ধারণ করে অহল্যার কাছে গেলেন। অহল্যা তাঁর ছদ্মবেশটা ধরতে পেরে গেছিলেন বলে অনেকে, কিন্তু তিনি ইন্দ্রের প্রস্তাবে সম্মতি দেন। কেউ কেউ বলেন, ইন্দ্র জোর করে বা ছল করে এই কাজ করেন। চুদুরবুদুর করার পর ইন্দ্র পালাতে গিয়ে গৌতমের সামনে ধরা পড়েন।

এসব দেখে গৌতম রেগে মেগে ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন — “তুমি আমার রূপ ধারণ করে অন্যায় করেছো, তাই তোমার গালগোটিয়া খসে পড়ুক”। কোনো কোনো সংস্করণে ইন্দ্রের সারা শরীরে সহস্র যোনি-চিহ্ন পড়ে, যা নাকি পরে চোখে পরিণত হয়।

দর্শক ৩।। ইন্দ্রের বহুনারীসম্ভোগে সিফিলিস হয়েছিলো বোধহয়। এইসব বেদ-পুরাণের গপ্পে সাঁটে কথা কওয়া হয়, তাই এতোসব লুকোচাপা। এদিকে বেচারি অহল্যাকেও অভিশাপ  দিয়েছিলেন গৌতম — তিনি পাথরে পরিণত হয়ে দীর্ঘকাল বাতাস খেয়ে, ছাইয়ের উপর শুয়ে তপস্যা করবেন।তারপর  Waiting for Godot হয়ে যায় Waiting for Rama! Rama the Messiah!  

নটী।। ওদিকে দেখুন বিবাহ সূক্ত (১০.৮৫)-এ সাধারণত একজন স্ত্রীর সঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবনের আদর্শ বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, বৈদিক সমাজে পলিগ্যামি ছিল বীরত্ব এবং দেবত্বের শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এক বিবাহই ছিল আদর্শ। লম্পট মাতাল ইন্দ্রের ক্ষেত্রে এই একাধিক স্ত্রীর কথা বেশি ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর ঐশ্বর্য, বীরত্ব দেখানোর জন্য। ওই আবার দিবি আরোহণ আরকী!  

দর্শক ৩।। ওই যেমন স্নুপগেট কুচ্ছোয় মোটাভাই সাহেবের জন্য মান্সী সোনির পেছনে ধাওয়া করেছিল গুণ্ডা সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে। এও সেইরকম আরকী! মধু কিশ্বর নামের ভদ্রমহিলা দেখলুম মোদির যৌন কুচ্ছো নিয়ে কিসব বলছেন। Fact check না করে কিসসু কইবোনা ভাই। খাকি গুণ্ডারা বজরং দল সমেত পোঙায় পড়ে যাবে। 

দর্শক১।। আসল কথাটাই তো কইলে না হে! এপ্সটাইন ফাইল এক্কারে ইন্দ্র-মোদি সমীকরণে একসঙ্গে খাপে খাপ।

দর্শক ২।। কীসব আলবাল কথা বলছিস তোরা। তোদের কর্মফল তোরাই ভুগবি।

দর্শক ১।। আরে তোদের সুব্রমনিয়ম স্বামীই তো এসব তথ্যের জোগানদার। একবার ওনার এক্স বা টুইটার প্রোফাইল খুলেই দেখ না।  

দর্শক ৩।। তুই কি জানিস ইন্দ্র গরুর মাংস খেতে ভালোবাসতেন?

তবে শোনঃ

বৃষাকপায়ি রেবতী সুজাতে বহ্বোষধে ।

ইন্দ্র এষাং বুলানাং মেদ উদরং পিপর্তু মে ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৩)

হে বৃষাকপায়ি! ইন্দ্র তোমার ষাঁড়গুলো খাবেন, তোমার প্রিয় বলি যা অনেক ফল দেয়।

স্বয়ং ইন্দ্র কইছেনঃ পঞ্চদশ চ মে শতং বৃষাণাং অজিজনন্ । অদামি তস্য মেদসঃ পূর্ণং উদরং মে ॥(ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৪)

ইন্দ্র বলছেন যে তাঁর জন্য ১৫-২০টা ষাঁড় রান্না করা হয় এবং তিনি তার চর্বি খান।

আরো আছে। বলছি।

ত্রী যচ্ছতা মহিষাণামঘো মাস্ত্রী সরাংসি মঘবা সোম্যাপাঃ । (ঋগ্বেদ ৫.২৯.৮)

“তুমি (ইন্দ্র) তিনশো মোষের মাংস খেয়েছ এবং তিনট পুকুর সোম পান করেছ।”

[নটী হঠাৎ করেই গান ধরে, বোধহয় কথা ঘোরানোর তাগিদে–]  

সংশয়তিমিরমাঝে না হেরি গতি হে।

প্রেম-আলোকে প্রকাশো জগপতি হে ॥

বিপদে সম্পদে থেকো দূরে, সতত বিরাজো হৃদয়পুরে—

তোমা বিনে অনাথ আমি অতি হে ॥

নটী।। সংশয়তিমির? না, আমরা তিমিরবিলাসী নই, জীবন-আনন্দে তিমিরবিনাশী। তাই তো করি সংশয়। এমনকী জগপতি পুংটাকেও সংশয় করি। Doubt everything—এর নজির আমি আগেই দিয়েছি নাসদীয় সূক্ত থেকে, বলেছি হিরণ্যগর্ভের জিজ্ঞাসার আকুলতার কথা। এই জিজ্ঞাসা বা Will to know-কেই গীতায় বলা হবে, “পরিপ্রশ্ন”ঃ

তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।

উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ॥ ৪.৩৪ ॥

জিজ্ঞাসার Will to know যাতে Will to power বিজিগীষায় না পরিণত হয়, তার জন্য চেতাবনি দিচ্ছেন গীতার অসংখ্য লেখকরা। মানে কয়ে দিচ্ছিঃ “সেই জ্ঞান লাভ করো প্রণিপাতের দ্বারা, পরিপ্রশ্নের দ্বারা এবং সেবার দ্বারা। তত্ত্বদর্শী জ্ঞানীরা তোমাকে সেই জ্ঞান দান করবেন।”

অপরীক্ষিত জীবনের জ্যান্ত থাকার মানে নেই কোনো—একথা কইবেন সোক্রাতেস।

[ত্বরিৎগতিতে প্রবেশ করি আমি]

আমি।। আমার যে কিছু পরিপ্রশ্ন আছে।

নটী।। অবশ্যই করুন। কিন্তু কুতর্কের দোকান খুলে, মাথা ফাটাফাটি করে বিতণ্ডা করবেন না যেন। আবার বিচারের প্রত্যাশা করে, ঠিকভুল মাপতে বসে গেরুয়া সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন না যেন। শুধু তত্ত্বজিজ্ঞাসায় মাতলেই আমি রাজি বাদে যেতে। আমাদের ন্যায়দর্শনে গণতান্ত্রিক তক্কো চালানোর এমনই তরিকা বাৎলানো আছে। সংঘের লোকজন এসব জানে না অবশ্য।

দর্শক ২।। এই ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আমি সংঘের লোক।

নটী।। দুর ছাই। সাধে কী আর শিব্রাম কয়েছেন, “সংঘ মানেই সাংঘাতিক”! হ্যাঁ, চলুক এবার পরিপ্রশ্নের লীলেখেলা।

আমি।। এই দিবি আরোহনে আমি স্বর্গের যে চেহারা পাচ্ছি তা’তো আমজনতার হাতের বাইরে। উর্বশী-রম্ভাদের বেলি ড্যান্স, মদমাংস—সব রাজসিক ব্যাপারস্যাপার। এর সঙ্গে  ঐশ্বর্যের দারিদ্র্য দেখতে পাই আম্বানির ছেলেমেয়েদের বিয়ের আসরে। রাজসিক ব্যাপারস্যাপার। ঐশ্বর্যই কী স্বর্গ তবে?

নটী।।  

সুরসভাতলে যবে নৃত্য করো পুলকে উল্লসি

হে বিলোল হিল্লোল উর্বশী,

 ছন্দে নাচি উঠে   সিন্ধুমাঝে তরঙ্গের দল,

শস্যশীর্ষে শিহরিয়া কাঁপি উঠে ধরার অঞ্চল,

তোমার মদির গন্ধ অন্ধ বায়ু বহে চারি ভিতে,

            মধুমত্ত ভৃঙ্গ-সম মুগ্ধ কবি ফিরে লুব্ধ চিতে   উদ্দাম গীতে।

নূপুর গুঞ্জরি চলো আকুল-অঞ্চলা   বিদ্যুতচঞ্চলা।।

একটা গপ্পো শুনুন। মহাপ্রস্থান শেষে করে যুধিষ্ঠির যা দেখেছিলেন, তারই গপ্পো পড়ছি মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্ব থেকে–

পাণ্ডবরা রাজ্য ত্যাগ করে হিমালয়ের দিকে যাত্রা করেন। পথে একে একে দ্রৌপদী, সহদেব, নকুল, অর্জুন ও ভীম মারা যান (প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ ছিল তাদের ছোটখাটো কিছু দোষ)। শুধু যুধিষ্ঠির এবং একটি কুকুর (যা ছদ্মবেশে ধর্ম) স্বর্গের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছোন।

ইন্দ্রের রথ এসে যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু যুধিষ্ঠির কুকুরকে ফেলে যেতে অস্বীকার করেন। কুকুরটা যুধিষ্ঠিরের বাপ ধর্মরাজ।

স্বর্গে পৌঁছে যুধিষ্ঠির প্রথমে যা দেখেন, তাতে তিনি হেব্বি খচে যান।

তিনি দেখেন দেবতাদের সঙ্গে দুর্যোধন স্বর্গে একটি প্রোজ্জ্বল সিংহাসনে বসে আছেন। দুর্যোধন বীরের মতো সম্মানিত।

কিন্তু তাঁর নিজের ভাইয়েরা (ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব), দ্রৌপদী, কর্ণ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রৌপদীর ছেলেদেরও তিনি স্বর্গে দেখতে পান না।

যুধিষ্ঠির রেগেমেগে বলেন — “যে দুর্যোধন পৃথিবী ধ্বংস করেছে, বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে স্বর্গে? আর আমার ধার্মিক ভাইয়েরা কোথায়?”

নারদ তাঁকে বলেন যে দুর্যোধন যুদ্ধে বীরের মৃত্যু হয়েছে এবং পবিত্র স্থানে মারা গেছে, তাই স্বর্গ পেয়েছে।

যুধিষ্ঠির তাঁর ভাই ও দ্রৌপদীর স্থান দেখতে চান। দেবতারা তাঁকে নরকে নিয়ে যান। সেখানে যুধিষ্ঠির দেখেন:

তাঁর ভাইয়েরা, দ্রৌপদী, কর্ণ প্রমুখ সবাই ভয়ানক যন্ত্রণা ভোগ করছেন।

যুধিষ্ঠির সেখানেই থাকতে চান এবং স্বর্গে ফিরে যেতে অস্বীকার করেন।

এটা ছিল শেষ পরীক্ষা। কিছুক্ষণ পর ইন্দ্র ও অন্য দেবতারা আসেন। যন্ত্রণার দৃশ্য আদতে মায়া। আসলে সবাই তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে স্বর্গে গিয়েছিলেন। যুধিষ্ঠিরের ধৈর্য ও করুণার পরীক্ষা সম্পূর্ণ হয়।

তারপর যুধিষ্ঠির স্বর্গে ঢোকেন এবং ভাইদের সঙ্গে মিলিত হন।

আমি।। এতো বড়ো প্যাঁচের ব্যাপার। বোঝাবুঝির বাইরের ব্যাপার।

দর্শক ২।। হে হে। আমাদের বিশ্বগুরু এমনই স্বর্গীয় জীবনযাপন করেন। আপনাদের ধরাকরার বাইরে! সবই তো মায়া?

নটী।। দেখুন উনিজির যাপনের মহিমা। একটা ছোট্ট ফিলিম দেখুন। গানটাও মন দিয়ে শুনবেন।

আমি।। এবার আমার দ্বিতীয় পরিপ্রশ্নঃ এই সঙ্ঘের লোকেরা আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি কেন খেলে?

দর্শক ১।। হ্যাঁ, হক কথা বটে। আমি নিজে স্বচ্ছতার সন্ধানী সত্যান্বেষী–Transparency activist। আমার RTI-গুলো সব Dismiss করে দিয়েছে এই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোর আর কোনো Accountability নেই। RTI মৃত।

নটী।।

হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্ ।

তত্ত্বং পূষন্নপাবৃণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে ॥

সত্যের মুখ হিরন্ময় মানে সোনার পাত্তর দিয়ে ঢাকা) আছে। হে পূষন তুমি সেই আবরণ সরিয়ে দাও, যাতে আমি সত্যান্বেষী হয়ে সত্যকে দেখতে পাই। (ঈশ উপনিষদ, ১৫)

দর্শক ১।। এরা এত্তো সোনা সোনা করে কেন?, হিরণ্যগর্ভ-এর ‘হিরণ’ তো সোনা বই আর কিছু নয়। আমরা তো ভলতেয়রের কাঁদিদ পড়েছি, মার্ক্সের সোনা-ঘেন্নার কথাও জানিঃ ভোক্তার সোনার কামনা সোনা-পণ্যরতি হয়ে ওঠে, তাও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। আর কার কাছেই বা প্রার্থনা করবেন? আজকের দিবি আরোহিত দেবতা নেতা-ন্যাতাদের কাছে? তারাই তো সোনা পাচার গ্যাঙ্গ-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সোনা দিয়েই ঢাকা রেখেছে সত্যের মুখ।

দর্শক ২।। না, না, না। ওটা তিনোমূল করে, আমরা করি না। আমরা সংস্কারী।

(ঘর জুড়ে তুমুল হাস্য)

দর্শক ৩।। রাখুন মোশাই আপনাদের সনাতন সংস্কার। আপনাদের কেলোর কীর্তি সব জানা আছে।

আমি।। এবার আমার তৃতীয় আর শেষ পরিপ্রশ্নঃ ভোট দেবো কাকে? কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম? এই প্রশ্নটা নিয়ে বড়ই মুশকিলে পড়েছি।

নটী।। মুশকিলে পড়লে মুশকিলআসান আছেন। তাঁদের পরে ডাকছি। আগে দুটো ছোট্ট ফিলিমস দেখি।

আমি।। এতো দেকি আরো মুশকিলে ফেললেন।

দর্শক ৩।। আপনি কি মনে করেন ভোট দেওয়াই শুধু গণতন্ত্র?

দর্শক ২।। নিশ্চয়ই।

দর্শক ৩।। না, কখোনই না। MP, MLA-এদের দিবি আরোহণ অভীষ্ট নয় মোটেই।দরকার সংলাপী গণতন্ত্রের । গণতন্ত্র এক ধরণের হয়ে ওঠার ব্যাপার। Politically illiterate হলে সংসদীয় গণতন্ত্র ধনীর হাতি চড়ার সুখবিলাস হয়ে দাঁড়ায়। এবার বরং এই ছবিটা দেখুন মন দিয়ে– সংলাপ খতম-তম-তম!

আমি।। আরে মশাই, এই যে ছবিতে দেখলুম, সব পার্টিই একই তাস খেলছে। সেইজন্যই কইছিলুম আর কী!

দর্শক ১।। দেখুন, এই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কিন্তু অবৈধ। কেননা ভোটার তালিকায় যে বিরাট মাপের গণ্ডগোল চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, তাতে এই নির্বাচন আগেই বাতিলের তালিকায় চলে গেছে–illegitimate । আমাদের কাছে তার পাথুরে প্রমাণ আছে। এমনকি একটা গণ্ডগোলও যদি থাকে, তাহলেও পুরো ভোট প্রক্রিয়াই বাতিল হবে। একজন ব্রাজিলীয় মডেলের নাম ভোটার তালিকায় থাকলে, পুরো ভোট অ-ব্যাবস্থা বাতিল।

দর্শক ২।। মানে?? কোথায় গণ্ডগোল? জ্ঞানবাবু কখনোই কোনো ঝামেলা সহ্য করেন না, কোরবেনও না। আর কি সব অসম্ভব কথা আপনি কইছেন? একটা ভুলে সবটা বাতিল? ইসির প্রক্রিয়া একদম নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক।

নটী।। উনি যেটা বোলছেন, সেটা হল নাসিম তালেবের ব্ল্যাক সোয়ান ধারণা একটা বা দু’টা অপ্রত্যাশিত উদাহরণ অনেক সময় পুরোনো তথ্য ও প্যাটার্নের ওপর তৈরি করা বড় বড় সাধারণীকরণকে একেবারে ভেঙে দিতে পারে। তুমি যদি বলো “সব হাঁস সাদা”, তাহলে, একটা কালো হাঁস দেখিয়ে তোমার সত্যঘর ভেঙে চুরমার করে দেওয়া যায়।

এই ধরণের ইন্ডাকটিভ রিজনিং-এরও (যেমন “ইসিআইয়ের তথ্য অনুসারে বেশিরভাগ ডিলিশনই যাচাইকৃত মৃত্যু, স্থানান্তর বা ডুপ্লিকেট”) একাধিক সীমাবদ্ধতা আছে। যদি স্যাম্পল অসম্পূর্ণ হয়, পক্ষপাতদুষ্ট হয়, বা স্থানীয় সমস্যাগুলোকে ধরতে না পারে, তাহলে সেই সাধারণীকরণ ভুল হয়ে যেতে পারে।

তোর বক্তব্য, “ইসির প্রক্রিয়া একদম নির্ভুল ও বৈজ্ঞানিক” — এই দাবির বিরুদ্ধে একটা বৈধ প্রতিউদাহরণ দিই; আমাদের ছেলে, যে কিনা আমাদের বাড়িতেই থাকে, তার ঠিকানা আলাদা। এটা দেখিয়ে দেয় যে, ২০০২ সালের ভোটার লিস্টের সঙ্গে অ্যালগরিদমিক ম্যাপিং এবং ঘরে ঘরে যাচাইয়ের ফাঁকফোকরের কারণে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মিল না থাকার মতো ঘটনা ঘটছে। এসব কিন্তু মাঠের রিপোর্ট বলছে— এটাই বলছে।

অনেক ভোটার জানিয়েছেন যে, তাঁদের ঠিকানা বদলে গেছে, নামের বানান ভুল হয়েছে, এবং এনুমারেশন ফর্মের ভুলের কারণে একই পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা এন্ট্রিতে চলে গেছে।

রাজ্যজুড়ে যে ১.২৫ থেকে ১.৪ কোটি “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” ফ্ল্যাগ হয়েছে, তার ডিজিটাইজেশন এবং পুরোনো লিস্টের সঙ্গে লিঙ্ক করার সময়। বেশিরভাগই এই ধরনের ডেটা মিসম্যাচের কারণে হয়েছে।

দর্শক ২।। কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে ভ্যাবলার মতো জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে) এসব হেরো পাব্লিকদের কথা।

দর্শক ৩।। তাই বুঝি? আরো শুনুন তবে। আচ্ছা, আপনি কি জানেন, এভিএম যন্তরটা কোনো প্রযুক্তি-উন্নত দেশ ব্যবহার করে না? আপনি যে বোতামই টেপাটেপি করুন, ভোট কোথায় পড়বে তার ঠিকঠিকানা আছে কি?

আমি।। আমি আদতে আমার মুশকিল আসান করতে চাইছিলুম। আপনারা আমাকে তো বেশ ফাঁপরে ফেললেন। তাহলে করবোটা কি?

নটী।। (চেঁচিয়ে) মুশকিলআসান হাজির।

[গান গাইতে গাইতে ঢুকে পড়ে চামর হাতে মুশকিলআসানের দল]

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর

আজি মুশকিল আসান করো দয়াল মানিক পীর

ওমা সকালে উঠিয়া পীর করিল গো মন

গোয়ালের ঘরে গিয়া দিল দরশন

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর

হিন্দু মুসলমান মিলে সিন্নি করে দান

জাত-পাতের ভেদাভেদে দুনিয়া যে অস্থির

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর

গাজী পীর সবাইকে চিনে, পীর কে চিনে কে

মড়িয়া হইয়া তেনার নাম জপে যে

আহা মুশকিল আসান করো দয়াল গাজী পীর

কইল কাতার ঘুটে শরিফ গাজী পীরের স্থান

হিন্দু মুসলমান মিলে সিন্নি করে দান

(আহা সিন্নি করে দান)

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর

দুঃখের দিনে ডাকি তোমায়, দয়াল সত্যপীর

বিপদে পড়লে রক্ষা করো, হে মালিক সত্যপীর

মা-বাপ ছাড়া কেহ নাই, তুমি আছো দয়াল

মুশকিল আসান করো, করো দয়াল সত্যপীর

পীরের দরবারে সিন্নি দিলে, বিপদ যায় দূরে

হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই, জাতের ভেদ নাই আর

মুশকিল আসান করো দয়াল সত্যপীর…

( চামর দিয়ে সবার মাথা ছুঁইয়ে বারবার বলে এই ধুয়া। ঘরে ছড়িয়ে পড়ে চন্দনসুবাসিত ধুনোর গন্ধ)

দর্শক ২।। কী অলুক্ষুণে কাণ্ড বাপু। এতো দেখছি হিন্দু-মোছলমান এক হয়ে কীসব আনতাবড়ি কাজকম্মো করছে।

দর্শক ১।। এসব গোবলয়ের লোকজন বুঝবে না। এই সত্যপীর বাংলার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে) একটি অনন্য দেবতা এবং পীর। এটা হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় সংশ্লেষণের (syncretism) সবচেয়ে প্রোজ্জ্বল নমুনা। ১৬শ শতাব্দীর সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমল থেকে এই সংশ্লেষণ চালু। সে সময়েই লেখা শেখ ফয়জুল্লাহ-র “সত্যপীর কাব্য” (১৫৪৫-১৫৭৫) এটার প্রথম লিখিত রূপ। এটা মুসলিম “পীর” (সাধু/অলি) ধারণা এবং হিন্দু “সত্যনারায়ণ”–বিষ্ণুর এক অবতার, সত্যের প্রতীকী দেবতার মিলন। : সত্যনারায়ণ — সত্যের দেবতা, যিনি কলিযুগে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করেন। পূজায় সিন্নি আর পীর — “সত্যের পীর”, একজন সাধক যিনি মুসলমানদের বিপদে সাহায্য করেন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় একইভাবে পূজা করে। কোনো জাতি-পাতির ভেদ নেই। পূজায় “সিন্নি” দান, গান-পালা, মানত — সবই মিলেজুলে একাকার। ধর্মান্তরিত মুসলমানদের পুরোনো হিন্দু দেবতা-পূজার সঙ্গে মিশে গেছে। মনে রাখবেন, এই সময়ই শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর দুহাত তুলে সংকীর্তন মিছিলে জাতপাত আর ধর্মীয় ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিচ্ছেন এই বাংলায়। এই গান শাস্ত্রীয় ধর্মের বাইরে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের ভাষা।

দর্শক ২।। ধর্মান্তরিত মোছলমান? মুসলিম বাদশারা জোর করে হিন্দুদের মোছলমান বানিয়েছে।

দর্শক ৩।। আজ্ঞে না। হিঁদু করদ রাজা, জমিদার আর বামনাই জাতপাতের ঠেলায় পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে চাষাভূসোরা। মনে রাখবি রে হিন্দু-মোছলমান বলে কৃষকের পরিচয় ঠিক হয় না। দুই ধম্মের চাষারা একই ভাবে শোষিত হয়। অবশ্য চাড্ডিবাবু এসব বুঝবে না। দেশের সমস্ত আয় আর সম্পত্তি আদানি-আম্বানি-পিরামলদের হাতে তুলে দিয়েছে মো-শাহ গ্যাঙ… কাজেই শ্রমিক-কৃষকের শোশিত আর্তনাদের ভাষা বুঝবে ক্যামনে এই সদাগর-পোষিত খ্যামতাধারীর দল?

দর্শক ১।। সে আর বলতে! তবে শুধু কৃষক নয়, বাউল-ফকির সাধকরাও এই গান গান। লালন ফকিরের ধারায় তাঁরা ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাত-পাত, মসজিদ-মন্দিরের বাইরে “মনের মানুষ” খোঁজেন। গানটি তাঁদের মানুষ-ভজা ফকিরি পালা বা সত্যপীরের গান-এর অংশ। উত্তর ২৪ পরগনা, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ ইত্যাদি এলাকায় এখনও গাওয়া হয়। এসব তো তোরা জানিস না।

নটী।। ফকিরি গানে নারীরাও সগৌরবে থাকেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গাওয়া হয়।

নটী।। এবারে দেখুন বেলুড়ের মন্দির স্থাপত্য। হিন্দু-মোছলমান-কেরেশ্চান সব একাকার হয়ে গেছে এই মন্দির-মসজিদ-চার্চে। মনে আছে কি আমাদের ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথা। উনি কিন্তু, এই সব ধর্মেই দীক্ষিত ছিলেন। এমনকি ওনার ভাষ্যেই জানা যায়, উনি এই সংশ্লেষণী সাধনায় গরুর মাংস জিভে ঠেকিয়েছিলেন।

আমি।। এসব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ভোট যখন হয়েই গেছে আড়ালে আবডালে, তাহলে আর কী দরকার ভোট দেওয়ার রিচ্যুয়ালে যাওয়ার। বরং হাঁক পাড়ি, “বয়কট করো এই ভোট।”

নটী।। আপনি রিচ্যুয়ালের কথা বললেন না? মনে পড়ে গেলো, “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি” আচার দিয়ে হবেটা কী? কি হবে বাহ্য আড়ম্বরযুক্ত অগ্নিহোত্রাদি কর্মে মেতে? কী পাও তুমি মোচ্ছবে? শুনুন তবে একটা পেসাদী গানঃ

জাঁকজমকে করলে পূজা, অহংকার হয় মনে মনে।
তুমি লুকিয়ে তারে করবে পূজা, জানবে না রে জগজ্জনে ॥
ধাতু পাষাণ মাটির মূর্তি, কাজ ফিরে তোর সে গঠনে।
তুমি মনোময় প্রতিমা করি, বসাও হৃদি পদ্মাসনে ॥

দর্শক ৩।। একমত। আমি মনে করি, তথাকথিত most oldest সনাতনকে ধরেই, বাহ্যিক আড়ম্বর নয়–জ্ঞানযোগের মাধ্যমে পরাবিদ্যায় পাড়ি দিতেই হবে। নইলে ডাফার হয়ে পড়ে থাকতে হবে। পুরুষসূক্তে কথিত যজ্ঞ তাই আমার কাছে অন্তরের যজ্ঞ। নিজের ভেতরের রিপুগুলোকে আগে পোড়াতে হবে তো। নিজের মাথার মধ্যের ফ্যাসিবাদ, পুংতন্ত্রকে আগে আক্রান্ত করতে হবে।

নটী।। অনেক তো বহস হলো। এবার খিদে পাচ্ছে। হ্যাঁ খিদে–সমস্ত অর্থনীতির উৎসস্থল–পেট আর পেটের নিচ–আমাদের রসুইঘর আর আমার পেশাঃ বারাঙ্গনা শ্রমিক। আসুন খাবার যজ্ঞে মাতি এই হোমানলে।

দর্শক ২।। খাবার মেনু কী?

নটী।। তোর পছন্দ হবে না রে। আমরা ঋগ্বেদীয় মতে খাবার খাবোঃ গরুর মাংস পোড়া আর Rum। Old Monk Rum–বুড়ো ঋষির রাম-মদ। এখন তো আর সোমরস, বারুণী, মৈরেয় মেলে না। রামদেবের পতঞ্জলিকে একবার বলে দেখলে হয়।

দর্শক ১ আর ৩।। বেশ বেশ। বীরাঙ্গনা bar-অঙ্গনার Barbeque জমে ক্ষীর।

দর্শক ২।। এ আবার কেমন ম্লেচ্ছ মেনু। গোমাংস? ডাকছি আমাদের গোরক্ষকদের। ঋগ্বেদের কোথায় আছে এমন কথা?

নটী।। নিজেই খুঁজে দেখে নিন। স্বয়ং যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন, : “আমি গরুর মাংস খাই, যদি তা কোমল বা tender হয়।” (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.১.২.২১) আপনাদের most oldest সনাতন কালে যজ্ঞ, অতিথি সৎকার, বিবাহ ও শ্রাদ্ধে গরু/ষাঁড় বলি ও মাংস খাওয়া অনুমোদিত ছিল।

আপাতত আমি আগুনের ব্যবস্থা করি। BBQ-এর grill-টা নিয়ে আসি।

দর্শক ১ আর ৩।। দাঁড়ান, দাঁড়ান BBQ-এর grill-টা আমরাই নিয়ে আসি। ততক্ষণ আপনি এই রামপাঁঠাটাকে বৈদিক গোমাংসবিধিবাক্য বোঝান।

[ওনারা বেরিয়ে যান। একা নটীকে পেয়ে এবার দর্শক ২ ঝাঁপিয়ে পড়তে যায়। শুরু হয়ে যায় নটীর যুযুৎসুর মারপ্যাঁচ। নিজের বাঁড়া ধরে শুয়ে পড়ে কাতরাতে থাকে চাড্ডি।]

দর্শক ২/ চাড্ডি।। ওরে বাবারে মরে গেলুম রে। ওরে বেশ্যা মাগী শোন, বেশ্যাকে ধর্ষণ করাই যায়!!!

নটী।। সম্মতি ছাড়া কাউকেই কিছু করা যায় না রে চাড্ডি। এই কথাটা বলার জন্য আরো ক্যালানি খাবি। আমি পৃথিবীর আদিম বেওসা করি। তুইও তাইঃ আরেকটা আদিম বেওসা জুয়ো খেলা খেলিস শেয়ার বাজারে।

[দর্শক ১ আর ৩-এর প্রবেশ। অবস্থাগতিক বুঝতে পেরে ওরা চাড্ডিকে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মঞ্চের বাইরে। জ্বলে ওঠে হোমানল। নটী শিকের ভেতর গরুর মাংস গুঁজতে গুঁজতে কথা কয়ে চলে]

নটী।। ভাবুন তো দেখি, এই “সনাতন” ঋকবেদীয় কবিরা কেমন সব খাওয়াদাওয়া নিয়েও কবিতা লিখেছেন।

উক্ষান্নায় বশান্নায় সোমপৃষ্ঠায় বেধসে । স্তোমৈর্বিধেমাগ্নয়ে ॥ (ঋগ্বেদ ৮.৪৩.১১)

আমরা স্তোত্র দিয়ে অগ্নিকে পূজা করি — যিনি সোমরস দিয়ে ম্যারিনেট করা ষাঁড় ও বন্ধ্যা গরুর মাংস খান ।

{নটী গরুর মাংস সেঁকতে সেঁকতে গাইতে থাকেন]

অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্ । হোতারং রত্নধাতমম্ ॥ অগ্নে ত্বং বসুধা নয়া অগ্নে ত্বং বসুধা নয়া । অগ্নে ত্বং বসুধা নয়া অগ্নে ত্বং বসুধা নয়া ॥: অগ্নিনা রয়িমশ্নবত্ পোষমেব দিবেদিবে । য়শসং বীরবত্তমম্ ॥ অগ্নে য়ং য়জ্ঞমধ্বরং বিশ্বতঃ পরিভূরসি । স ইদ্দেবেষু গচ্ছতি ॥অগ্নে হব্যবাডনঃ স নো বিশ্বা সৌভগান্য । দেবান্ হবিষা গময় ॥ উপ ত্বা অগ্নে দিবেদিবে দোষাবস্তর্ধিয়া বয়ম্ । নমো ভরন্ত এমসি ॥ রাজন্তমধ্বরাণাং গোপামৃতস্য দীদিবিম্ । বর্ধমানং স্বে দমে ॥ স নঃ পিতেব সূনবে অগ্নে সূপায়নো ভব । সচস্বা নঃ স্বস্তয়ে ॥

[মদ আর মাংস খেতে খেতে হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে গিটার হাতে, ভগৎ সিং-এর টি-শার্ট-পরা এক যুবক। তার গলায় এক ইংরেজি গান]

বন্ধু আমার, এসো বসি কল্পনায়

ধরো নেই কোনো রাজার সীমানা,

নেই কো কাঁটাতার

নেই কোনো দখলদার,  

নেই কো পাশপোর্ট,

নেশন বলে কিছু নেই আর

কষ্ট পেয়ো না এ কল্পনায় দোস্ত আমার,

খুনখারাবি? যুদ্ধু?

অকারণ কেনো মাতো হিংসেয়?  

ধম্মে ধম্মে নেই কোনো দাঙ্গাফাসাদ   

আমরা সকলে  মিলেজুলে

প্রশান্তিতে বাঁচছি এই ছোট্ট গ্রহে  

তুমি হয়তো বলবে,

আমি স্বপ্ন কল্পনায় বিভোর,

কিন্তু, জেনো বন্ধু,  

আমি কেবল একা নই এই স্বপ্নে

আশা করি, একদিন তুমিও আসবে আমাদের সঙ্গে

এই ছোট্ট গ্রহে হবো আমরা একাকার 

সেখানে নেই কোনো মালিকি দাপট

ভাবো বন্ধু, ভাবো কমরেড,

ভাবা প্র্যাকটিস করো,  

লোলুপ জিভ চাটবে না কোনো দখলদার

রোটি-কাপড়া-মকানেই আমরা সুখি পরিবার,

এই বসুধা তো একই পরিবার

মনে করো সব জ্যান্তরা

শেয়ার না খেলে শেয়ার করছে এই বিশ্বকে

শেয়ার আর কেয়ার  

তুমি হয়তো বলবে,

আমি স্বপ্ন কল্পনায় বিভোর,

কিন্তু, জেনো বন্ধু, 

 আমি কেবল একা নই এই স্বপ্নে

আশা করি,  তুমিও আসবে একদিন আমাদের সঙ্গে

হাতে হাত মিলিয়ে–

বলে উঠি–

অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্ব ধর্ম সার
অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওঙ্কার।
সে অন্নে যে বিষ দেয় কিংবা তাকে কাড়ে
ধ্বংস করো, ধ্বংস করোঁ, ধ্বংস করো তারে।

Comments

Popular posts from this blog

Justice via Intimidation? A Financially Abused Citizen vs. the Corporate-State Nexus

Shut Down Arms Factories to Stop Wars: Dismantling the Global War Profiteering Machine

Why Today’s India Cannot Deny Its Undeclared Emergency